| ঢাকা , বুধবার, ০৭ আগস্ট ২০১৯

তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পের প্রসার ও উন্নয়নের মাধ্যমে এ খাতে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি বহুমুখীকরণ, সরকারের সেবার মান উন্নয়ন ও জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়া এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৩০ হাজার (৩০,০০০) প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যাত্রা শুরু হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের একটি প্রকল্প। লিভারেজিং আইসিটি ফর গ্রোথ, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স সংক্ষেপে এলআইসিটি নামের এই প্রকল্প গত ৩০ জুন, ২০১৯ শেষ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন সহায়তায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি খাতে নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে অসামান্য অবদান রেখেছে প্রকল্পটি।

২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাল ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হলেও পরবর্তীতে সংশোধনের মাধ্যমে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বর্ধিত করা হয়। ৭৯৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার এ প্রকল্পে সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয় ২৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং বাকি অর্থ বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয়।

পুরো মেয়াদে এলআইসিটি প্রকল্প যেসব উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে তার মধ্যে বিভিন্ন স্তরে প্রশিক্ষণ, জব ফেয়ার, দেশে-বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিয়ে প্রচার-প্রচারণা, নীতি-কৌশল প্রণয়নে সহায়তা, গবেষণা, ডিজিটাল সেবা চালু, সাইবার নিরাপত্তা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কমপক্ষে ৩০ হাজার দক্ষ জনবল তৈরি করা। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বমানের আইটি প্রশিক্ষণে ৩৩ হাজার ৫৬৪ জন আইটি প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল তৈরি করা হয়। এদের মধ্যে ইতোমধ্যেই ১১ হাজার ১৩১ জন চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। এলআইসিটি প্রকল্পে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রশিক্ষণে অন্তত ৩০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হয়।

দেশের ইন্ডাস্ট্রি এবং অ্যাকাডেমিয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। ফলে প্রতি বছর হাজারো গ্র্যাজুয়েট বের হলেও চাকরিদাতারা যোগ্য লোক পান না। তাই আইসিটি, সিএসই, আইটি এবং সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটদের ইন্ডাস্ট্রির উপযোগী করতে এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। টপ-আপ আইটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা সরাসরি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। দেশের বিভিন্ন পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, কানেক্টিভিটি তথা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা ১০ হাজার হলেও টপ-আপ আইটি প্রশিক্ষণে মোট ১০ হাজার ৫৮৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যার মধ্যে ইতোমধ্যেই ৬ হাজার ৪৮২ জন চাকরিতে নিযুক্ত হয়েছেন।

যে কোন বিষয়ে গ্র্যাজুয়েটধারীরা যাতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যোগদান করতে পারে তার জন্য ন্যূনতম দক্ষতা অর্জনের জন্যও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়। বিপিও, মাইক্রো-ওয়ার্ক, কমিউনিকেশনসহ নন-টেকনিক্যাল চাকরির জন্য সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনদের সমন্বয়ে দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। মোট ২০ হাজার ৩৬৯ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যার মধ্য থেকে দুই হাজার ৪০৫ জন চাকরিতে প্রবেশ করেছেন।

প্রশিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা অনেক সময় তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ পায় না। অন্যদিকে নিয়োগদাতা আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে ও কম সময়ে সঠিক কর্মী নির্বাচন করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্য নিয়েই এলআইসিটি নফংশরষষং.পড়স-নামের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য ভবিষ্যৎ আইটি নেতৃত্ব তৈরিতে ফাস্ট ট্র্যাক ফিউচার লিডার (এফটিএফএল) প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এতে সফট স্কিল, আইটি ইন্ডাস্ট্রির মৌলিক জ্ঞান এবং কোর্সভিত্তিক বিশেষায়িত প্রাযুক্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বাছাইয়ের পরই তাদের ঢাকার বাইরে আবাসিক প্রশিক্ষণ, ঢাকায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং সব শেষে আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এই প্রশিক্ষণের আওতায় ২ হাজার ৬১০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যার মধ্যে ইতোমধ্যেই ২ হাজার ২৪৪ জন চাকরিতে নিযুক্ত হয়েছেন।

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যম স্তরের কর্মকর্তারা যাতে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতিতে বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে পারে এবং তাদের দক্ষতার উন্নয়ন করতে পারে, প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রয়োগ, নেতৃত্বগুণ তৈরি এবং পরবর্তী দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে তার জন্য এসিএমপি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ভারতের আইআইটি এবং আইআইএমের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) যৌথভাবে এই প্রোগ্রাম তৈরি করে। ‘অ্যাডভান্সড সার্টিফিকেশন ফর ম্যানেজমেন্ট প্রফেশনালস (এসিএমপি ৪.০)’ কোর্সের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫২৬ জনসহ অতিরিক্ত আরও ১১৬ জন প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সিএক্সও লেভেলের কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিকমানের তৈরি করতে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগিতায় দুটি ফেইজে ঢাকা ও সিঙ্গাপুরে এই প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। বিজনেস ডেভেলপমেন্ট, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, ইনোভেশন, লিডারশিপ, ডিজাইন থিংকিং ইত্যাদি বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রথমে ফেইজে ২৪ জন এবং দ্বিতীয় ফেইজে ২৬ জন সর্বমোট ৫০ জন সিএক্সও এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

শুধু প্রশিক্ষণ নয়, দেশের তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পের প্রসারেও এলআইসিটি প্রকল্পটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। মূলত বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অসামান্য অগ্রগতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরা, ব্যবসায় প্রচার ও প্রসার এবং নলেজ শেয়ারিংয়ের জন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রথমত, আইটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে আউটরিচ কর্মসূচি ‘স্ট্র্যাটেজিক সিইও আউটরিচ প্রোগ্রাম’ গ্রহণ করা হয়। এই কর্মসূচির আওতায় দেশি ও বিদেশি কোম্পানিসমূহের মধ্যে সংযোগ স্থাপন, দেশি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আনয়ণের লক্ষ্যে বস্টন কনসালটিং গ্রুপ (বিসিজি) এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা হয়। নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের ব্যবসা সম্প্রসারণ সংক্রান্ত ৩১টি প্রশিক্ষণ সেশন সম্পন্ন করা হয়। এছাড়া নিউইয়র্ক, ব্যাঙ্গালোর, কলকাতা, হায়দ্রাবাদ, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান ও সিঙ্গাপুরে ৮৫টি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেশি-বিদেশি কোম্পানির ম্যাচমেকিংয়ের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য লিড ট্র্যাকিং টুল তৈরি করে ২০০টির অধিক বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচমেকিং সংস্থা অ্যাক্সেলারেন্সকে বাংলাদেশের ৫টি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করে দ্রুত আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রসারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া এই উদ্যোগের আওতায় দেশে বিনিয়োগে সহযোগিতা প্রদানের জন্য একটি হেল্পডেস্ক স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। আইবিএমের সঙ্গে একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী ৬টি কোম্পানিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আরও ৩টি কোম্পানি অদূর ভবিষ্যতে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এছাড়া ‘ইনভেস্ট ইন ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক ক্যাম্পেইনের আওতায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ক্যারিয়ার গড়তে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে এবং এ খাতে আগ্রহী করার জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, যশোর, রংপুর ও খুলনাতে ৯টি আইটি/আইটিইএস চাকরি মেলার আয়োজন করা হয়। এ সব মেলায় লক্ষাধিক চাকরিপ্রার্থী অংশগ্রহণ করে। এসব মেলায় অংশগ্রহণকারী দেশের শীর্ষস্থানীয় শতাধিক কোম্পানি প্রায় ৩ হাজার জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে ৬৫৭ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ প্রদান করে। সরাসরি সাক্ষাৎকার ছাড়াও তরুণ-তরুণীদের চাকরির জন্য প্রস্তুতি, দক্ষতা, সম্ভাবনা, আগামী দিনের প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সেমিনার, আলোচনা, কর্মশালার ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে তৃতীয় যে উদ্যোগটি নেয়া হয় তা হলোÑ আইসিটি ক্যারিয়ার ক্যাম্প। দেশের ৬৪ জেলায় অনুষ্ঠিত হয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশের সবচেয়ে বড় এই আয়োজন। দেশের প্রতিটি জেলার বিশ্ববিদ্যালয় অথবা সরকারি কলেজে মোট ৭০টি ইভেন্টে লক্ষাধিক তরুণ-তরুণীর সমাগম হয়। আইসিটি ক্যারিয়ার ক্যাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে আগ্রহী করে তোলা। এই আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের একটি অনলাইন তথ্যভা-ারের মধ্যে নিয়ে আসা। অনলাইন-অফলাইনে সর্বমোট ৮৩ হাজার ২৭২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করে। নিবন্ধনকৃতদের সব তথ্য একটি ডেটাবেইজ বা তথ্যভা-ারে সংরক্ষণ করেছে এলআইসিটি প্রকল্প।

চতুর্থত, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকৃতচিত্র নিয়ে মৌলিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা বহুদিনের। গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ তথ্য উপাত্ত না থাকায় এতদিন এ খাতের প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে এক ধরনের অপূর্ণতা বিরাজমান করছিল। আর তাই, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকৃত চিত্র, বিনিয়োগ সুযোগ-সুবিধা, সম্ভাবনা, সরকারের অবস্থান এবং ভূমিকা নিয়ে এভারেস্ট গ্রুপ, আইডিসি এবং এইচএফএস কর্তৃক তিনটি অ্যানালিস্ট রিপোর্ট (শ্বেতপত্র) তৈরি এবং প্রকাশ করা হয়েছে। আর এসবের মাধ্যমে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিয়ে বিশ্বব্যাপী আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে এবং ইতোমধ্যেই দেশ সফলতা পেতে শুরু করেছে।

পঞ্চম, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রাক-বাজেট আলোচনা, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও আইওটি ডিভাইস উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার এবং কাস্টমস ডিউটি ১ শতাংশে কমিয়ে আনা, আইসিটি পণ্য রফতানিতে ১০ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে এলআইসিটি প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০১৮ প্রণয়নের প্রতিটি পর্যায়ে এলআইসিটি প্রকল্পের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে।

ছয়, ই-গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নেও ভূমিকা রেখেছে এলআইসিটি। ই-গভর্ন্যান্সের ব্যবহার প্রশাসনকে দ্রুত ও কার্যকরী করে, সেবা উন্নত হয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও উৎসাহিত করে। ই-গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নে এলআইসিটি প্রকল্প বেশ কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে।

এ প্রকল্পের আওতায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩৫৫ একর জমির ওপর স্থাপিত ‘বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটিতে’ চীনের সহযোগিতায় প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠছে টায়ার ফোর ডেটা সেন্টার। এই ডেটা সেন্টার হবে এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ ডেটা সেন্টার। আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর মাধ্যমে সরকারি সব ধরনের গুরুতপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্যসহ ব্যাংক, গবেষণা কেন্দ্র, বাণিজ্য সংস্থার তথ্য সংরক্ষণ করা হবে এ ডেটা সেন্টারে। ফলে দেশের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ডেটা আরও সুরক্ষিত হবে। ক্লাউড কম্পিউটিং ও জি-ক্লাউড প্রযুক্তির ফোর টায়ার ডেটা সেন্টার দেশে স্থাপন হওয়ায় দেশের ডেটা নিরাপত্তায় উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশও তথ্য নিরাপত্তায় স্বনির্ভর হয়ে উঠবে।

জাতীয় ই-সেবার সমন্বিত কাঠামো বাংলাদেশ ন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজ আর্কিটেকচার (বিএনইএ) প্রকল্পটি ২০১৪ সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু হয়। এলআইসিটি প্রকল্প বিএনইএ বাস্তবায়নের কাজ তদারকি করে। একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যব্যবস্থা, প্রক্রিয়া, অঙ্গ-সংগঠন এবং লোকবল কীভাবে সমন্বিত উপায়ে কাজ করবে, তা এন্টারপ্রাইজ আর্কিটেকচার ব্যাখ্যা করে। বিএনইএ এর মেরুদ- হলো জাতীয় ই-সার্ভিস বাস। ই-সার্ভিস বাস মূলত ইলেকট্রনিক তথ্য বিনিময় করার একটি মিডলওয়্যার প্ল্যাটফর্ম। বর্তমানে তিনটি সেবা থাকলেও পর্যায়ক্রমে সব সরকারি সেবা জাতীয় ই-সার্ভিস বাসে সংযুক্ত হবে। এছাড়া কোন সরকারি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতর বিএনইএ প্রণীত মানদ-, নীতিমালা, সহায়ক নির্দেশিকা ইত্যাদি বাস্তবায়ন ও মেনে চলছে কিনা, তা যাচাই করার জন্য একটি সফটওয়্যার টুল বানানো হয়েছে। বিএনইএ এবং ই-জিআইএফ ফ্রেমওয়ার্ক ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইটিইউ থেকে ডব্লিউএসআইএস প্রাইজ ২০১৮ অর্জন করেছে। যা বিদেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

প্রকল্পের অধীনে, বাংলাদেশ সরকারের ই-গভর্নমেন্ট নেটওয়ার্ক এবং একই ধরনের অবকাঠামোতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংগঠন হিসেবে ক্যাটালিস্টের ভূমিকা রাখা এবং সাইবার আক্রমণের খবর প্রকাশ ও আক্রমণ রোধে করণীয় বিষয়ে কাজ করতে বিজিডি ই-গভ সার্ট (কম্পিউটার ইনসিডেন্স রেসপন্স টিম) গঠন করা হয়। দেশের ক্রিটিক্যাল অবকাঠামোগুলোতে সাইবার সেন্সর স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। বিসিসিতে তৈরি করা হচ্ছে সাইবার ডিফেন্স ট্রেনিং সেন্টার।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে অসাধারণ উদ্যোগ আর অর্জনে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো এলআইসিটি প্রকল্প। শুধু প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রচার আর প্রসারের মাধ্যমেই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ডিজিটাল অর্থনীতির পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে খুব ছোট অথচ উদ্ভাবনী এ প্রকল্পটি। দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রসার, তরুণ-তরুণীদের দক্ষতা উন্নয়ন, মেধা বিকাশ ও কর্মসংস্থান এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এলআইসিটি প্রকল্প। আর এই উন্নয়নে ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে এলআইসিটি প্রকল্পেরও ধারাবাহিকতা রাখতে হবে।